প্রতিটা পরিবারের এক একটা ছেলে টাকা উৎপাদনের মেশিন!

  • ফারজানা আক্তার 
  • ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৮

ছোট বেলা থেকে শুনে এসেছি এবং দেখে এসেছি আমার এই সমাজ পুরুষ শাসিত সমাজ । পরিবার থেকে শুরু করে সর্ব ক্ষেত্রে পুরুষের আধিপাত্য । পুরুষের অধিক শাসনে নারীরা বিরক্ত কিংবা পুরুষের এত আধিপাত্ত্যে নারীরা বিচলিত, তাই নারীরা তাদের আধিকারে মাঠে নামলেন । নারীরা তাদের প্রাপ্য সম্মান এবং অধিকারের আন্দলনে জয়ী হলেন । আমিও একজন নারী, আমার সমগোত্রীয়দের এই জয়ে আমিও গর্বিত এবং বিমোহিত ।
  
নারীদের জন্য বিভিন্ন আইন হলো, বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি পরিক্ষা, চাকরিতে তাদের জন্য আলাদা কোটা হলো । মোটামোটি সকল ক্ষেত্রে নারীদের আলাদা বাসের সিট, বিভিন্ন কাজের জন্য আলাদা সিরিয়াল, কোথাও কোথাও আলাদা কাউন্টার হলো । যেহেতু আমি একজন নারী তাই আমি জানি নারীদের জন্য আলাদা সিট, সিরিয়াল, কাউন্টার কতটা জুরুরি । 

কিন্তু বিভিন্ন পরীক্ষা কিংবা চাকরিতে নারীদের জন্য আলাদা কৌটা আমি মানতে পারছি না । কেন মানতে পারছি না তার একটা ছোট্ট উধাহরন দেই । বর্তমানে নারীরা তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন, তাই তো ? অধিকার সচেতন নারীরা বলেন যে ছেলেদের থেকে তারা নাকি কোন অংশে কম না । আমিও জানি এবং মানি মেয়েরা ছেলেদের থেকে কোন অংশে কম না, তাহলে পরীক্ষা কিংবা চাকরিতে মেয়েদের জন্য আলদা কৌটা কেন লাগবে ? যেহেতু তারা কোন অংশই কম না, তাই তাদের 

উচিত সমান সমান অধিকার নিয়ে পরীক্ষা দিয়ে নিজের যোগ্যতার প্রমান দেখানো। নারীদের মেধা কিন্তু পুরুষের মেধার থেকে কোন অংশে কম না। শুধু মাত্র আলাদা কৌটার জন্য নারীদের মেধার সকল ক্রেডিট কৌটাতে চলে যাচ্ছে। আবার, এই আলাদা কৌটার জন্য একজন যোগ্য ছেলে চাকরি পাচ্ছে না, অন্যদিকে যোগ্য ছেলেটি থেকে একটু কম মেধার মেয়েটি চাকরি পেয়ে যাচ্ছে। দেশের উন্নতি কিংবা আমাদের উজ্জ্বল ভবিৎষতের জন্য আমাদের যোগ্য মানুষ দরকার, হোক সে ছেলে কিংবা মেয়ে।   

এতক্ষন বললাম ঘরের বাহিরের অধিকারের কথা। এখন বলি ঘরের কথা। যেহেতু নারীরা সমান অধিকারে সচেতন, তাহলে তাদের সমান দায়িত্বেও সচেতন হওয়া উচিত। আজকাল তো প্রায় সব পরিবারের মেয়েরাই চাকরি কিংবা ব্যবসার কাজে যুক্ত। সংসার চালানোর কাজে কি স্বামী - স্ত্রী প্রতি মাসে সমান সমান খরচ দেয় ? নাকি স্বামীর টাকায় সংসার থেকে শুরু করে বাকি সব খরচাপাতি চলতে থাকে, আর নিজের টাকা ব্যাংকে জমা রাখে! এই কথাটা হয়তো অনেকের কাছে একটু বিতর্কিত মনে হবে কিন্তু আমি বলবো আপনারা আগে বুঝার চেষ্টা করেন। সব মেয়ে যে এমন করে আমি কিন্তু সেটা বলছি না। কিন্তু এমনটা যে মেয়েরা করে তাদের সংখ্যাও কিন্তু নেহাৎ কম নয়। অধিকারের ক্ষেত্রে সমান সমান, কিন্তু নিজের কষ্টের টাকা সমানভাবে ভাগ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে পিছুটান! 

আমার নিজের কাছে যে বিষয়টা সবথেকে বেশি খারাপ লাগে তা হলো, একজন ছেলে বা পুরুষ যাই বলি না কেন তার কাছে আমাদের অনেক বেশি চাওয়া, অনেক বেশি আবদার। আমার মনে হচ্ছে দিনদিন আমরা পুরুষকে মানুষ ভাবতেই ভুলে যাচ্ছি। তাদেরকে টাকা উৎপাদনের মেশিন কিংবা নিজের দাবি -দাওয়া পূরণের মাধ্যম ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারছি না। এই ধরেন, আমি ফারজানা একজন মেয়ে। চাইলেই এখন চাকরি ছেড়ে দিতে পারি। কারণ আমার স্বামী আছে সে আমাকে চাকরি করে খাওয়াবে। 

কিন্তু আমার স্বামী কি চাইলেই তার চাকরিটা ছেড়ে দিতে পারে ? চাইলেই আমার মতো বাসায় বসে পায়ের উপর পা তুলে ষ্টার জলসা কিংবা জি সিনেমার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারবে ? আমি মেয়ে তাই আমার কাছে পরিবারের মানুষগুলোর তেমন চাহিদা নেই। তারা ভাবে আমি মেয়ে আমার কাছে কিসের চাহিদা ! বা হয়তো ভাবে আমি তাদের চাহিদা ঠিকমতো পূরণ করতে পারবো না। অথবা ভাবে আমি মেয়ে তাই পরিবারের বেশি চাপ নিতে পারবো না! পরিবার একজন মেয়েকে কি ভাবে সেটা সঠিকভাবে আমি বলতে পারবো না, কিন্তু পরিবার যে ছেলেগুলোকে টাকা উৎপাদনের মেশিন ভাবে এটা ঠিকভাবে বলতে পারবো। 

ছেলে -মেয়ে দুইজনেই বাবা - মায়ের সন্তান। সন্তানকে সঠিকভাবে লেখা পড়া করিয়ে মানুষের মতো মানুষ করার দায়িত্ব বাবা -মায়ের। বৃদ্ধ বয়সে কিংবা বাবা মায়ের অক্ষমতায় তাদের দেখা শোনা করা সন্তাদের কর্তব্য। সেই ছোট থেকে সন্তানকে বড় করতে বাবা মা'কে অনেক কষ্ট এবং ত্যাগ স্বীকার করতে হয় সত্যি। সন্তানের পিছনে তাদের কষ্টের টাকাও অনেক খরচ হয়। তাই বলে সন্তান যখন বড় হয়, তখন তার পিছনে অনেক টাকা খরচ করেছেন এই কথা আপনি বারবার তাকে মনে করিয়ে দিতে পারেন না। তার উপার্জনের কষ্টের টাকায় আপনার হোক আছে কিন্তু সে টাকা আপনি দাবি করতে পারেন না। ছেলেটা বেকার রয়েছে তাকে উঠতে বসতে আপনি টাকার জন্য খোঁটা দিতে পারেন না। ছেলে সন্তানের কাছে আপনি যেভাবে টাকা দাবি করে বসেন, আপনার মেয়েটার কাছে কি সেভাবে টাকা দাবি করেছেন কখনো ? দুইজনেই তো সন্তান, দুইজনের পিছনেই তো কষ্ট এবং অর্থ দুইটাই দিয়েছেন। 

আমি বাস্তব এমন কিছু ঘটনার সাক্ষী। আমার এক বন্ধুর চাকরি হচ্ছে না। এখন চাকরির জন্য ও যতটা হতাশ তার থেকে বেশি হতাশ ওর বাবা মায়ের আফসোস দেখে। চাকরি যে ছেলের হাতের মোয়া না এটা তারা বুঝতে চাচ্ছে না। আমার বন্ধুর বড় বোন (মনে হয় ২-২.৫বছরের বড়) ব্যাংকের চাকরির জন্য পরীক্ষার পর পরীক্ষা দিয়েই যাচ্ছে , পরিবার কিন্তু তার উপর কোনো প্রেশার দিচ্ছে না। পরিচিত এক বড় ভাই (ইঞ্জিনিয়ার ) , পড়াশোনা শেষ করার সাথে সাথে চাকরি পেয়েছে। চাকরির বয়স ২বছর। আপনারা তো জানেন এই দেশে ইঞ্জিনিয়ারদের চাকরির প্রথম দিকের বেতনের অবস্থা কেমন হয়!

যাই হোক সেই বড় ভাইকে তার পরিবারের প্রতিটা সদস্য প্রতি মাসের প্রতি সাপ্তাহে নতুন নতুন সমস্যা নিয়ে ফোন দিয়ে বলবে টাকা পাঠাতে। তো গত মাসে আমার সেই বড় ভাই নাকি আপন বড় ভাইকে বলছে টাকা শেষ , পরের মাসে দিবে। আমার সে ভাইয়ের বড় ভাই এখন তার পরিবার থেকে শুরু করে পুরো গ্রাম বলে বেড়াচ্ছে , "নিজে পড়াশোনা না কইরা ছোটভাইকে পড়াশোনা করাইছি। এখন সে ইঞ্জিনিয়ার হইয়া লাটসাহেব হয়ে গেছে। এই মাসে কিছু টাকা চাইছি মুখের উপর না কইরা দিছে। " আমার সেই বড় ভাই এখন দুঃখ করে বলে, "এতো কষ্ট করে পড়াশোনা করেছি সবাইকে নিয়ে সুখে থাকবো বলে, সবার চাহিদা আর চিন্তা ভাবনা দেখে মনে হচ্ছে পড়াশোনা করাটা জীবনের সবথেকে বড় ভুল হয়েছে। এই ভুলের মাশুল এখন যতদিন বাঁচবো ততদিন দিতে হবে। "

এমন কয়টা উদাহরণ দিবো? এমন ঘটনার হয়তো আপনি নিজেই ভিক্টিম, হয়তো আপনার পাশের জন এমন সমস্যায় রয়েছে। আমি এখানে মেয়েদের অধিকার, দায়িত্ব, কোটা, পারিবারিক চাহিদা সব নিয়ে কথা বললাম। পুরোটা পড়ার পর আপনাদের কি মনে হচ্ছে ? বর্তমান সমাজে করা বেশি অশান্তিতে আছে ? ভাই ও বোনেরা দুনিয়াতে মানসিক অশান্তির মতো অশান্তি মনে হয় অন্য কিছু নেই। টাকা পয়সার কষ্ট, ক্ষুধার কষ্ট , শারীরিক কষ্ট মেনে নেওয়া যায় কিন্তু মানসিক কষ্ট অসহনীয়। একে খুব সহজে কাবু করা যায় না। পরিবর্তন দরকার, খুব বেশি পরিবর্তন দরকার। অধিকারের পরিবর্তনের থেকে আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন সবার আগে দরকার।

Leave a Comment