ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিস্তারিত পড়ুন
- ইয়াসিন প্রধান সাজিদ
- মে ৩১, ২০২০
চট্টগ্রাম বিভাগের অন্তর্গত জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া। এ জেলার দক্ষিণে কুমিল্লা জেলা আর পশ্চিমে নারায়নগঞ্জ জেলা, নরসিংদী জেলা ও কিশোরগঞ্জ জেলা, উত্তর দিকে রয়েছে কিশোরগঞ্জ জেলা ও হবিগঞ্জ জেলা এবং পূর্বে হবিগঞ্জ জেলা ও ভারতের ত্রিপুরা প্রদেশ। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আয়তন ১৯২৭.১১ বর্গ কিলোমিটার।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় : ১৮৬৮ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর শহর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।। ১৮৭৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্তর্গত ছাগলনাইয়া থানা ত্রিপুরা জেলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। তারপর থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত এই জেলাটি ত্রিপুরা জেলা নামেই পরিচিতি লাভ করে। ১৯৬০ সালে এসে প্রশাসনিক আদেশে ত্রিপুরা জেলাকে কুমিল্লা জেলা নামে অভিহিত করা হয়। তারপরে চব্বিশ বৎসর পর ১৯৮৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী গঠিত হয় বর্তমান সময়ের এই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আঞ্চলিক উচ্চারণ মূলত 'বাউনবাইরা'। তাছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিকৃত নাম 'বি-বাড়িয়া' বহুল প্রচলিত। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোট জনসংখ্যা ২৮,৪০,৪৯৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১৩,৬৬,৭১১ জন এবং মহিলা ১৪,৭৩,৭৮৭ জন। মোট পরিবার ৫,৩৮,৯৩৭টি। (পরিসংখ্যান-২০১১)
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোট জনসংখ্যার মধ্যে সাক্ষরতার হার মাত্র ৪৫.৩%। যেটির দিক থেকে হয়তো একটু পিছিয়ে আছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে। এ জেলায় রয়েছে ৪১টি কলেজ, ৩টি কারিগরী, ৮৯৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৮২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১টি ল'কলেজ, ১টি নার্সিং ইন্সটিটিউট, ১টি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়াারিং স্কুল, ১টি পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট, ১টি পিটিআই রয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিশেষত্ব নিয়ে যদি আলোচনা করি তাহলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া একাধারে মসলিন কাপড়, মিষ্টান্ন, তালের রস, তালের বড়া, পুতুল নাচ, রসমালাইয়ের জন্য ব্যাপক পরিচিত ও বিখ্যাত। মুঘল আমলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মসলিন কাপড় তৈরির জন্য বিখ্যাত ছিল। এ জেলার বিখ্যাত মিষ্টান্নের মধ্যে ছানামুখী অন্যতম, যা দেশের অন্য কোন অঞ্চলে তেমন প্রচলন নেই। এছাড়া তালের রস দিয়ে তৈরি আরেকটি মিষ্টান্ন তালের বড়া ও রসমালাই বিখ্যাত ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তাঁত শিল্প বিখ্যাত। ১৯৬২ সালে আবিষ্কৃত ও ১৯৬৮ সালে গ্যাস সরবরাহ শুরু করা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাস ফিল্ড দেশের এক-তৃতীয়াংশ গ্যাস সরবরাহ করে থাকে।
আশুগঞ্জ তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র ।যার জন্য অন্যান্য জেলা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা অনেক এগিয়ে এবং অনেক উন্নতি সাধন করছে। তাছাড়াও আশুগঞ্জ সার কারখানা দেশের ইউরিয়া সারের অন্যতম বৃহত্তম শিল্প কারখানা । অন্যদিকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়াা বন্দর । এ বন্দরের মাধ্যমে ভারতে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি হয় । যার স্থাপত্যকাল ১৯৯৪ সালে স্থাপিত হয় । এখানে বিসিক শিল্পনগরী স্থাপিত হয় ১৯৮৫ সালে । ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে বলা হয় বাংলাদেশের "সাংস্কৃতিক রাজধানী।"
আকর্ষনীয় ব্যাপার হচ্ছে পুতুল নাচের জন্যও ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিখ্যাত । ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম পুতুল নাচের প্রচলন করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার কৃষ্ণনগর গ্রামের বিপিন পাল। তীয় উপমহাদেশে প্রথম পুতুল নাচের প্রচলন করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার কৃষ্ণনগর গ্রামের বিপিন পাল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আরেকটি গর্ব ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠ এর ১ জন ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার।
সারা দেশের সাথে যোগাযোগের স্থাপনা বা মাধ্যম হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া দুটি হাইওয়ে রোডের সাথে সরাসরি সংযুক্ত। তার একটি হল ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক, যেটি এশিয়ান হাইওয়ে নেটওয়ার্ক এর অংশ এবং অপরটি হল কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়ক। জেলাটির সরাইল উপজেলার বিশ্বরোডে দুটি হাইওয়ে রোড মিলিত হয়েছে।
রেললাইনের মাধ্যমে যোগাযোগের কথা বললে : ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সাথে ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহের রেল যোগাযোগ রয়েছে। তাছাড়াও যদি এ জেলার সাথে নদীপথে যোগাযোগের কথা বলা হয় তাহলে-ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় নৌকা যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম তিতাস ও মেঘনা নদী। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আরেকটি গর্বের বিষয় হলো ু জেলার আশুগঞ্জে আন্তর্জাতিক নৌ-বন্দর স্থাপন করা হয়েছে এবং এটি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় মালামাল পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে জেনে নেই।
মুক্তিযুদ্ধে ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সম্পূর্নভাবে হানাদার মুক্ত হয়। বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল ১৮ এপ্রিল ১৯৭১ সালে আখাউড়ার দরুইন গ্রামে শহীদ হন । ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর বিজয়নগর উপজেলার এক যুদ্ধে দুজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ এবং ১১ জন আহত হন । পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২৫ জন নিহত ও ১৪ জন বন্দী হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে গড়ে তোলা হয়েছে কুল্লাপাথর শহীদ স্মৃতিসৌধ। এখানে ৫০ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কবর রয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় রয়েছে অনেক দর্শনীয় স্থান এবং ঐতিহাসিক স্থানসমূহ। আরও রয়েছে জানা অজানা অনেক রহস্যময় বিষয়বস্তু। তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া দর্শনে অনেক দূর দুরান্ত থেকে মানুষ ভিড় জমায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাটিতে। প্রতি বছর দেশের অর্থনৈতিক এবং বিভিন্ন খাতে উন্নতি সাধনে ব্যাপক অবদান রাখছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া।





