নবজাতকের জন্ডিস নিয়ে আপনি চিন্তিত!
- রেজবুল ইসলাম
- জানুয়ারি ১৩, ২০১৮
জন্মের পর থেকেই অনেক শিশু জন্ডিস রোগে আক্রান্ত হয় । সঠিক পরামর্শের অভাবে অনেকে চিন্তিত হয় এ বিষয়ে । চিকিৎসা না পেলে শিশুর মৃত্যুও হতে পারে। নবজাতকের জন্ডিস নিয়ে কিছু কথা।
জন্ডিস কীঃ
জন্ডিস কী আগে এই বিষয়টি বুঝি। আমাদের শরীরে যে রক্ত হয়, প্রতিনিয়ত সে রক্তটা ভেঙ্গে যায়। ভেঙ্গে গিয়ে নতুন রক্ত তৈরি হয়। এখান থেকে বিলুরুবিন বের হয়। এর রংটা হলুদ। এর পরিমাণ যখন বেড়ে যায় তখনই জন্ডিস হয়। নবজাতকের যখন এটি হয়, তখন আমরা একে নবজাতকের জন্ডিস বলি।
নবজাতকের জন্ডিস কেন হয়- এই বিষয়ে বলি, অনেকে মনে করে, এটি হয়তো খারাপ কিছু। জন্ডিস বললে সবাই একটু ভয় পেয়ে যায়। বড় বাচ্চাদের যে জন্ডিস সেটা সাধারণত সংক্রমণের কারণে হয়। তবে নবজাতকের জন্ডিস খুব স্বাভাবিক একটি ব্যাপার। মায়ের পেটে থাকাকালীন শরীরে যে বেশি পরিমাণে রক্ত থাকে, লাল রক্ত কণিকা, সেটা ডেলিভারি (প্রসব) হওয়ার পর আস্তে আস্তে ভেঙ্গে যায়। ভেঙ্গে বিলুরুবিনটা বের হয়ে আসতে থাকে। এরপর আমাদের লিভার একে প্রসেসিং (প্রক্রিয়াজাত) করে সলিউবল (দ্রবণীয়) করে প্রস্রাব পায়খানা দিয়ে বের করে দেয়। এতে জন্ডিস কমে যায়। কিন্তু নবজাতক যারা, তাদের এই জন্ডিস সামলানোর শক্তি কম থাকে। কারণ, তার লিভার অপরিপক্ব থাকে। এর জন্য সে সবটুকু বের করতে পারে না। তখনই তার জন্ডিস বৃদ্ধি পায়।
কীভাবে বোঝা যাবে শিশুর জন্ডিস আছেঃ
(১) নবজাতকের শরীর হলুদাভ হয়ে যায়।
(২) প্রথমে মুখ হলুদাভ হয়। আস্তে আস্তে শরীর হলুদ হবে, এমনকি হাত ও পায়ের তালু পর্যন্ত হলুদ হয়ে যাবে। পুরো শরীর হলুদ হয়ে গেলে বিলম্ব না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
(৩) শিশু দুধ পান করে না।
(৪) পেট ফুলে যায়।
(৫) নড়াচড়া কম করে।
(৬) শরীরে তীব্র জ্বর থাকতে পারে। আবার শরীর অতিরিক্ত ঠাণ্ডাও হয়ে যেতে পারে।
(৭) কোনো কোনো ক্ষেত্রে খিঁচুনিও হতে পারে।
(৮) প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা
জন্ডিসের মাত্রা ও কারণ নির্ণয়ের জন্য শিশুবিশেষজ্ঞের পরামর্শক্রমে নবজাতকের রক্তের প্রয়োজনীয় কিছু পরীক্ষা করাতে হয়। যেমন-রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা এবং তা প্রত্যক্ষ না পরোক্ষ তা নির্ণয়, মা ও নবজাতকের রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা, কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট, কুম্বস টেস্ট, রেটিকুলোসাইট কাউন্টসহ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
চিকিৎসা কখন লাগে?
সাধারণত জন্মগত কারণে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ জন্ডিস পরিলক্ষিত হয়। এসবের বেশির ভাগই ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস বা সাধারণ জন্ডিস। এ ক্ষেত্রে বয়স্কদের চেয়ে শিশুর দেহের রেড সেল ভলিউম বা লোহিত রক্তকণিকা বেশি থাকে। এই রক্তকণিকার স্থায়িত্ব কম থাকে। তাই লোহিত কণিকা ভেঙে বিলিরুবিন বেশি তৈরি হয়। লিভার পুরোপুরি কার্যক্ষম হয় না বলে শরীরে বিলিরুবিন জমে যায়। তাই নবজাতকের জন্ডিস বেশি হয়।
ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিসের ক্ষেত্রে নবজাতককে প্রতিদিন আধা ঘণ্টা করে ১০ দিন সূর্যের আলোতে রাখলেই ভালো হয়ে যায়। তবে জন্ডিসের মাত্রা বেশি মনে হলে (বিলিরুবিন ১৪ বা তার বেশি হলে) হাসপাতালে এনে ফটোথেরাপি দিতে হয়। নবজাতকের রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা কেমন, শিশু কত সপ্তাহে জন্ম গ্রহণ করেছে, বিলিরুবিন কী পরিমাণে বাড়ছে তার ওপর চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা নির্ভর করে। নবজাতকের জন্ডিস হলে সাধারণত বেশি করে বুকের দুধ খাওয়াতে হয়। এতে বারবার পায়খানা হয়, পায়খানার মাধ্যমে শরীরে জমে থাকা বিলিরুবিন বের হয়ে যায়।
হাসপাতালে চিকিৎসা হিসেবে সাধারণত ফটোথেরাপি প্রয়োগ করা হয়। এক ধরনের বেগুনি আলোর মধ্যে, হালকা গরম আবহাওয়ায় শিশুটিকে কিছু সময়ের জন্য রাখতে হয়। শিশুকে সাধারণত চোখ ঢেকে দেওয়া হয়। শিশুর শারীরিক অবস্থা ঠিক থাকলে এ সময়ও কিছুক্ষণ পরপর বুকের দুধ পান করানো উচিত। বেশির ভাগ শিশু এক থেকে দুই দিন ফটোথেরাপি পেলেই ভালো হয়ে যায়। তবে নবজাতকের বিলিরুবিন যদি অতিমাত্রায় বাড়তে থাকে, তবে হাসপাতালে চিকিৎসা করানো উচিত। এ সময় শিশুকে রক্ত দেওয়ারও প্রয়োজন হতে পারে। কখনো কখনো ইন্ট্রাভেনাস ইমিউনোগ্লোবিউলিনও লাগতে পারে। মনে রাখা দরকার, বিলিরুবিনের অতি মাত্রা শিশুর মস্তিষ্কের ক্ষতি করতে পারে। জটিলতার মধ্যে আছে-সেরিব্রাল পালসি, কান নষ্ট হয়ে যাওয়া, কার্নিকটেরাস ইত্যাদি। তবে এগুলো খুব অল্প দেখা যায়।
জন্ডিসের প্রকারঃ
হেমোলাইটিক এনিমিয়া : এ ক্ষেত্রে নবজাতক রক্তশূন্য হয়ে পড়ে। তার লিভার ও প্লীহা বড় হয়ে যায়। চোখ বেশি হলুদাভ হয়। যথাসময়ে চিকিৎসা না হলে নবজাতকের লিভার ফেইলিওর হতে পারে। লিভার সিরোসিসও হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে শিশুটি মৃত্যুমুখে পতিত হতে পারে।
রক্তের গ্রুপজনিত জন্ডিস : নবজাতকের বা শিশুর রক্তের গ্রুপ যদি পজিটিভ, আর মায়ের নেগেটিভ গ্রুপের হয়-এ ক্ষেত্রে বিপজ্জনক ধরনের জন্ডিস হতে পারে। এ ছাড়া মায়ের রক্ত পজিটিভ হলেও এ ধরনের বিপদ ঘটতে পারে।
ইনফেকশন : নবজাতকের রক্তে ইনফেকশন ছড়িয়ে গেলে একে সেপটিসেমিয়া হয়। এটি হলে জন্ডিসও হয়। এ ক্ষেত্রে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে ৭ থেকে ১০ দিনের মতো সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করাতে হয়।
প্রি-ম্যাচুরিটি বা সময়ের আগে জন্মানো শিশু : অপরিণত জন্ম হলে নবজাতকের জন্ডিস হতে পারে। মাত্রা বেশি হলে ফটোথেরাপি দিতে হবে। আবার জন্ডিসের মাত্রা কম হলে (১৪ মি.গ্রা./ ডেসিলিটারের নিচে হলে) সূর্যের আলোতে ভালো হয়ে যায়।
মায়ের ডায়াবেটিস : কোনো নবজাতকের মায়ের ডায়াবেটিস থাকলে জন্মগ্রহণের পর নবজাতকের জন্ডিস হতে পারে। এ ক্ষেত্রে নবজাতকের শর্করা লেভেল স্বাভাবিক রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে 'রাউন্ড দ্য ক্লক ফিডিং' বা ঘন ঘন বুকের দুধ দিতে হবে।
হাইপো থাইরাডিজম : এ ক্ষেত্রে বুকের দুধ খেলেই জন্ডিস হয়। এ ক্ষেত্রে শিশুর থাইরয়েড হরমোন রিপ্লেসমেন্ট করাতে হয়।
এ ছাড়া কিছু কারণ রয়েছে যে জন্য জন্ডিস হয়। যেমন-এনজাইম ডিফেক্ট বা লিভার ব্লকেজ থাকলে, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অসম্পূর্ণ বা অরগান ডিফেক্ট থাকলে, নবজাতকের পিত্তথলিতে কোনো সমস্যা থাকলে, গ্লুকোজ সিক্স ফসফটাস এনজাইম ডিফিসিয়েন্সি থাকলে, পাইলোরিক স্টেনোসিস বা পাকস্থলীতে খাদ্য নির্গমনে কোনো বাধা থাকলেও জন্ডিস হতে পারে।
জন্ডিস হলে কি বুকের দুধ খাওয়ানো যাবে?
নবজাতককে কোনো অবস্থায়ই মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো থেকে বিরত রাখা যাবে না। শিশুকে নিয়মিত দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর পর মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। বিশেষ করে ফিজিওলজিক্যাল অর্থাৎ স্বাভাবিক জন্ডিসের মূল চিকিৎসাই হচ্ছে শিশুকে ঠিকমতো মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো।
ফটোথেরাপি বা আলো চিকিৎসা এবং রোদ চিকিৎসাঃ
বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে গেলে সাধারণত শিশুকে ফটোথেরাপি বা আলো চিকিৎসা দেওয়া হয়। বেশির ভাগ শিশু এক থেকে দুই দিন ফটোথেরাপি পেলেই ভালো হয়ে যায়। যদিও এর উপকারিতা ও কার্যকারিতা নিয়ে মতভেদ আছে, তারপরেও এখন পর্যন্ত এই পদ্ধতিটিই ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ছাড়াও ডাক্তারগণ প্রতিদিন সকালে নবজাতককে আধা ঘণ্টা রোদে রাখতেও পরামর্শ দেন। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে এটি যেন সকালের প্রথমদিকের এবং মৃদু রোদ হয়। সূর্যের কড়া রোদ এবং অতিবেগুনি রশ্মি শিশুর ত্বকের ক্ষতি করতে পারে।





